Wednesday, August 4, 2021

ফয়সাল মুহাম্মদের “প্রিয় FM” (দ্বিতীয় পর্ব)

কলমেঃ ফয়সাল মুহাম্মদ (দ্বিতীয় পর্ব)
letter isthar faysal
আশাকরি ভালোই আছ। আমি আসলে ভালো নেই। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে যখন কোনো সমস্যায় পড়তাম আলোচনা পর্যালোচনা তোমার সাথেই হত। সেই দিন অতীত হয়েছে। তারপরও কি আমরা তো বন্ধু। বন্ধুত্ব কখনো শেষ হয় না। তাই তো বিপদে পড়েই তোমার দারস্থ হয়েছি।
সেই যে বাংলা বাজারের এক প্রকাশনী মালিকের গল্প বলেছিলাম মনে আছে? তার মেয়ের সাথে প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছি। এ এক অসম প্রেম! মেয়েটা আমার থেকে ৬ বছরের বড়। তার উপর কট্টর কমিউনিস্ট। বর্তমানে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় বামপন্থী নেতা। আশ্চর্যজনক ব্যাপার তার বক্তব্য যা শত্রু মিত্রকে এক সারিতে নিয়ে আসে। ইতিমধ্যেই দেশের সকল বামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলোকে এক প্লাটফর্মে নিয়ে এসেছে সে।
মেয়েটার জন্মের ৬ দিনের দিন তার মা মারা গেছে। তারপর তার বাবা আর বিয়ে করে নি। ৮ বছর বয়সে তাকে জার্মানীতে তার মামার ওখানে পাঠানো হয়েছিল। হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে যখন সে দেশে ফিরল তখন তার বয়স ৩২ বছর। তার অর্জন কম নয়। ইতোমধ্যেই জীবনের ঝুলিতে জমা হয়ে গেছে কমিউনিস্ট বিষয়ক পড়া কয়েক হাজার বই , ১৮ টা দেশ ভ্রমণ, ২৭ টা বইয়ের লেখক হওয়া।
প্রচন্ড বৃষ্টির এক সন্ধ্যায় আমি প্রকাশকের বাসায় গিয়েছি আড্ডা দিতে। তাকে পাওয়া গেল না। মেয়েটা এসে আমার সামনে বসল। আমি তাকে সেই ভাবে চিনতাম না। সেই বৃষ্টিমুখর সন্ধ্যায় প্রথম পরিচয়। আমি প্রথমে তার পরনে গেঞ্জি আর প্যান্টের কারনে লজ্জায় তাকাতে পাচ্ছিলাম না তার দিকে। বিষয়টা বুঝতে পেরে সে একটা ওড়না জড়িয়ে নিয়েছিল। প্রকাশক যখন বাসায় ফিরল তখন রাত ১২.৪৫। তার মেয়ের সাথে আমার আড্ডা দেওয়ার সাড়ে ৬ ঘন্টা পূর্ণ হয়েছে। মেয়েটা আমাকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এসে বলল, তোমায় খুব মনে ধরেছে! তবে সমাজতন্ত্র সম্পর্কে তোমার পড়াশোনা শূন্যের কোটায়। আগে পড়াশোনা কর।
এরপর আমি প্রতিদিন যেতে শুরু করলাম তার বাসায়। ঘন্টার পর ঘন্টা আলোচনা হতে থাকল ইসলামের যাকাত,সুদ, খুলাফায়ে রাশেদার যুগ অন্যদিকে সমাজতন্ত্রের মাক্স, লেলিন, মাও,লাকা, ফুকো নিয়ে। কিন্তু এসবের মধ্যে কখন যে আমরা প্রেমে পড়লাম কেউই টের পেলাম না। সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর ২জন মানুষের কিভাবে প্রেম হতে পারে? একজন ইসলামপন্থী আরেকজন কমিউনিস্ট। চিন্তা ভাবনা, পরিবেশ পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন থাকার পরও একটা প্রেম জমে উঠল।
দিনদিন আমার পড়ার টেবিলে সমাজতন্ত্রের বই জমতে থাকল, কলমে সমাজতন্ত্রের তত্ত্বের আলোচনা লেখা হতে থাকল। আমার চিরপরিচিত লোকেরা আমার এই পরিবর্তনের কারণ খুজে পেল না। তিল তিল করে গড়ে উঠা একটা আদর্শ কিভাবে এত তাড়াতাড়ি ধুলোয় মিশে গেল সেই ভাবনায় তারা ডুবে গেল।
আমি সবচেয়ে অবাক হয়েছি এক সন্ধ্যায় যখন তার বাসায় নামাজ পড়ছি হঠাৎ দেখি সে আমার পাশে নামাজ পড়ছে! আমি সেদিন নিজেকেই বিশ্বাস করতে পারিনি।
সে ছোটবেলা থেকেই শার্ট-প্যান্ট পরা মানুষ। এক বিকেলে দেখি অগোছালো ভাবে শাড়ী পরে বসে আছে। আমি শাড়ী পরা পছন্দ করি তাই। এটা সে জেনেছে আমার কবিতার বই পড়ে। আমি তার শাড়ীর কুচি ঠিক করে দিয়েছিলাম সেদিন। সে আমার এই আচরণে মুগ্ধ হয়েছে।
আমার ছোয়ায় যেন তার সজীবতা আরও বেড়ে গিয়েছিল। সারাদিন সে পল্টন, প্রেসক্লাব, শাহবাগ বক্তব্য দিয়ে গরম করে রাখত। তবে কেন জানি সে দিনদিন আবেগী হতে থাকল। আমার কাছে তার চাওয়া রিকশায় করে শহর দেখা, কাচের চুড়ি আর ফুল কেনা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রইলো না।
এক জন্মদিনে আমার কাছে গিফট চাইল। আমি তাকে গিফট হিসেবে রাতের শহর দেখানোর প্রতিশ্রুতি দিলাম। সারারাত আমরা শহর দেখলাম। শেষ রাতের দিকে খোলা আকাশের নিচে এক যায়গা দাঁড়িয়ে সে আবেগে কেঁদে ফেলল। এমন ভীষণ ভাবে নাকি কেউ তাকে কোনোদিন উপলব্ধি করেনি!
আমি তার কাজকর্মে ভয়ে আছি। ঘুমের ঘোরে স্বপ্নে দেখি তার নেতৃত্বে দেশে সমাজতন্ত্র কায়েম হয়েছে। আজান নিষিদ্ধ করা হয়েছে। মুসলিম আর মসজিদগুলো ভালো নেই। আমি আঁতকে উঠি।সেই রাতে আর ঘুমাতে পারি না।
এখন বলি আসল কথা। এই মেয়েকে ছাড়া আমি বাঁচতে পারব না। কিন্তু তাকে নিয়েও বাঁচা যাবে না।আমরা যদি পালিয়ে বিয়ে করি যখন এটা প্রকাশ হবে আলেমেরা আমাকে কাফের ফতোয়া দেবে তাকে তার রাজনৈতিক দল অবাঞ্চিত ঘোষণা করবে। আমাদের এই অসম প্রেম কেউ মেনে নেবে না। আমার পরিবার, সমাজ, দেশ, ধর্ম কেউ না কেউ না! এখন আমি কি করি? জানি তুমি এই সমস্যা থেকে উদ্ধার পাওয়ার সমাধান দিতে পারবে।
তাই অনেক দিন পর তোমার শরনাপন্ন হলাম। তোমার উত্তরের আশায় রইলাম।
-ভালো থেকো FM ।
ধরণঃচিঠি
Previous Post
Next Post
Related Posts

0 comments: