Monday, August 2, 2021

ফয়সাল মুহাম্মদের "প্রিয় FM" (প্রথম পর্ব)

কলমেঃ ফয়সাল মুহাম্মদ
istahar cithi fm foysal
প্রথম পর্ব
আশা করি পরিবার পরিজন নিয়ে ভালোই আছ। আমিও বেশ ভালো আছি। তোমার সাথে পরিচয়ের সুত্রপাত ছিল কোনো এক কুয়াশা মোড়া ভোরে তোমার জন্মদিনের শুভেচ্ছা নিয়ে। এরপর দেখতে দেখতে জীবনের আরও ১৫ টি কুয়াশা মোড়া শীত পাড়ি দিয়ে আমরা এখন জীবন বাস্তবতার সায়াহ্নে।
তোমার আমার বন্ধুত্বের গল্প এই ২১০০ একরে সবারই অজানা। আমার ইচ্ছে ছিল এমনই। আমরা একই সাথে ৫ বছর আমাদের বন্ধুত্ব ফেসবুক, মেসেঞ্জার আর হোয়াটসঅ্যাপের কল্যাণে চালিয়ে নিলাম। রেলের চাকার মতো ঘুরতে ঘুরতে আমাদের সময় শেষ হয়ে গেল। চবিতে অনার্স ফাইনাল ইয়ারে থাকাকালীন এক বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায় তোমার বিয়ে হলো ঐ ভীষণ ভালো মানুষটার সঙ্গে।
শেক্সপিয়ার, অস্কার ওয়াইল্ড আর হুমায়ূন আহমেদ এর ছেলে মেয়েদের প্রেম সম্পর্কিত তত্ত্ব পা দিয়ে মাড়িয়ে আমরা আমাদের বন্ধুত্ব টিকিয়ে রেখেছিলাম। কিভাবে পেরেছিলাম জানিনা!তোমার আমার সম্পর্কের কিছুটা ঘাটতি পড়লেও ঘাটতি পড়েনি স্বপ্নে। আমরা আলাদা আলাদা নিজেদের স্বপ্নের দিকে এগিয়ে গিয়েছিলাম অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে।
চাকসু নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জোড়া খুনের সেই দুঃসময়ে তোমার প্রথম কন্যা সন্তান পৃথিবীতে আসল। আমি তখন ঢাকায় থাকি। আমাদের মাস্টার্সের পরিক্ষা আটকে গিয়েছিল এই খুনের কারণে। ৬ মাস বন্ধ ছিল পুরো ক্যাম্পাস। তোমার পরিবার নিয়ে ব্যস্ততা আর আমার সাংবাদিকতা আর লেখালেখির ব্যস্ততা আমাদের ভিন্ন মেরুর মানুষে পরিনত করল।
্যাগ ডের দিন তোমার মেয়ের ঐ সোনামুখ প্রথম দেখলাম ততদিনে সে অনেকটা বড় হয়েছে। বিদায় ভাষনে তোমার বলা একটা কথা আমি কোনো দিন ভুলিনি। তুমি উচ্চকণ্ঠে বললে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও এর সব ছাত্র শিক্ষকদের থেকে আমি যা শিখেছি তারচেয়ে কয়েক শতগুণ বেশি কিছু পেয়েছি আমার একটা ডিপার্ট্মেন্টের বন্ধুর থেকে। অজ্ঞাত কারণে তার নাম বলতে পারছি না। এই কথা শোনার পর আমার চোখ থেকে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়েছিল। যোগাযোগ কমে যাওয়ায় ভেবেছিলাম তুমি সব ভুলে গেছ, আমার ভুল ভাঙল আবার।
এরপর তোমাকে একটু অপেক্ষা করতে হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পেতে। যেদিন নিয়োগের অনুমোদন পেয়েছিলে আমায় ফোন করে অঝোরে কেঁদেছিলে তুমি। অনেকদিন পর সেদিন কথা হয়েছিল। তুমি শুধু বারবার বলেছিলে, আমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। ততদিনে আমি ঢাকা শহরে লেখক বনে গেছি।
এরপর আর পেছনে তাকাতে হয়নি তোমার। দারুণ মেধাবী, স্পষ্টভাষী, অন্যায়ের প্রতিবাদী হিসেবে অল্পদিনেই পুরো ক্যাম্পাসে তুমি জনপ্রিয় অধ্যাপকে পরিনত হলে।
দেখতে দেখতে এরই মধ্যে ১৫ বছর চলে গেল। এখন তুমি ৩ মেয়ের মা। তোমার ৩টা মেয়ে হবে এটা আমি বলতাম সেই সময়ে। কেমন কাকতালীয়ভাবে মিলে গেল এটা। তুমি আমার যেই প্রেমিকাটাকে চিনতে তার একদিন এক কর্পোরেট লোকের সাথে মহা ধুমধামে বিয়ে হল। আমি আর বিয়ে করলাম না তাকে ভেবে ভেবে।
সরকার আর তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে কলম ধরায় আমাকে মাতৃভূমি ছেড়ে প্রবাসে আসতে হলো। আমি তোমার কাছে লিখছি অস্ট্রিয়ার রাজধানী ভিয়েনার এক বাগানে বসে তোমার থেকে ৭,০০০ কিমি দূরে । ভাবছ তোমার চিঠি পাওয়ার পরও এতদিন পরে কেন লিখছি? গ্রীষ্মের ছুটির পুরো সময়টা আমি আফ্রিকার দেশ মৌরিতানিয়ায় কাটিয়েছি। ফিরে এসে তোমার এই চিঠি পেলাম।
প্রথমে তোমার চিঠি লেখার কারণ বুঝিনি। শেষের দিকে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির ইমেইলের ফটোকপি দেখে বুঝলাম তুমি আমেরিকায় যাচ্ছ অধ্যাপক হিসেবে। ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটিও তোমায় অফার করেছিল কিন্তু আমেরিকা তোমার বাঁচ্চাদের পড়াশোনা ভালো হবে ভেবে তুমি আমেরিকা যাচ্ছ। দেশে তোমার সহকর্মীরা হিংসায় জ্বলে মরছে এই ভেবে যে তোমার পিএইচডি নেই অথচ অত বড় বিশ্ববিদ্যালয় তোমায় অফার দিল!
আজকে নভেম্বরের ১ তারিখ। তোমার জন্মদিন। ১৫ বছর আগে এই দিনেই প্রথম কথা হয়েছিল তোমার সাথে। আর দেখা হবে না কখনো। কথাও হয়তো হবে না। তোমার সাথে সম্পর্ক নেই আমার অথচ সংযোগ রয়ে গেছে। আর এ জন্যই তুমি ৭,০০০ কিমি দূরে চিঠি লিখেছ আমিও উত্তর লিখছি। ভালো থেকো FM..
চলবে…
ধরণঃচিঠি
Previous Post
Next Post
Related Posts

0 comments: